আমি যে একজন সহজ-সরল মানুষ – এই বিষয়টি আমি আমার বিভিন্ন লেখায় বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছি।
তবে কোন এক বিচিত্র কারণে বেশীর ভাগ মানুষই আমার সেই সব পোষ্টকে “হাঃ হাঃ হিঃ হিঃ” করে “তামাশা” বানিয়ে দিয়েছেন।
তাদের জন্য বলছি, আপনাদের সাথে এই জাতীয় ভুল বুঝাবুঝিতে আমি মোটেও বিব্রত নই।
সত্য হলো, ভুল বুঝাবুঝির কারণে জীবনে আমাকে অনেকবারই এভাবে অপদস্থ হতে হয়েছে। তাই “ভুল বুঝাবুঝির” ব্যাপারটি আমার গা-সওয়া।
ভুল বুঝাবুঝির একটি উদাহরণ নিম্নরুপঃ
আমাদের বিয়ের পরপর-ই আমার বউ অসুস্থ হয়ে গেলেন।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন তাঁর প্রচন্ড জ্বর! সাথে খুকখুক কাশি আর গলা খুসখুস।
বউয়ের এই বেহাল অবস্থা দেখে, একজন আপাদমস্তক ভালো স্বামী হিসেবে, আমি তাই ঠিক করলাম আজকের নাস্তা-পানি আমি ম্যানেজ করবো। বউয়ের মাথায় পট্টি দিয়ে তাই বীরদর্পে এগিয়ে গেলাম রান্নাঘরের দিকে।
এক ঘন্টা পরের কথা, ফেইসবুকে শাশুড়ীকে হ্যাশট্যাগ “আমি_আপনার_মেয়েকে_দেখে_রেখেছি” লিখে একটা পোষ্ট দেব বলে উসখুস করছি।
বউকে বেশ আগ্রহ নিয়ে সদ্য লেখা পোষ্টটা দেখালাম।
পোষ্টে লেখা –
আজ সকালে উঠে বউয়ের জন্য –
১. ডিম পৌচ বানালাম।
২. পাউরুটি টোস্ট করলাম।
৩. চায়ে চিনি দিলাম (বউ আমাকে কাজ করতে দেখে শুয়ে থাকতে পারেনি। উঠে এসে নিজেও কাজে লেগে গেছে। একেই বলে ভালবাসা, একেই বলে প্রেম।)।
৪. বউকে নান রুটি ভাজতে সাহায্য করলাম। এবং
৫. আমার মা’য়ের আলুভাজি গরম করে দিলাম।
কিন্তু পোষ্টটা দেখার পর বউকে খুশি হবার বদলে রাগে গজরাতে দেখা গেল। বউয়ের ভাষ্য অনুযায়ী কারণ নিম্নরুপঃ
১. ডিম বানাতে হয় লবণ দিয়ে। ম্যায়োনেস লবনের পরিপূরক (replacement) নয়। তার ওপর আমি ডিম বেশী পুড়িয়ে ফেলেছি। আমার ডিম নাকি পৌচ এবং ওমলেটের মাঝামাঝি কিছু একটা হয়েছে। সুতরাং – অখাদ্য।
২. পাউরুটি আমি বেশী টোস্ট করে ফেলেছি। টোস্টারের সেটিংস ঠিকভাবে না দেয়ায় সব তাপ গিয়ে পড়েছে এক দিকে। পাউরুটির তাই এক দিক পুড়ে কয়লা! সুতরাং – অখাদ্য।
৩. ভুলে আমি চা-য়ে চিনির বদলে তিন চামুচ লবণ দিয়ে নিয়ে এসেছি। সুতরাং – অখাদ্য। (এরপর আমার ওপর আর ভরসা না করতে পেরে বউ নিজেই রান্নাঘরে ছুটে এসেছে)।
৪. নান রুটি ভাজতে হয়েছে উপরের ২ নম্বর পয়েন্টের জন্যে।
৫. সব শুনে আমার মা আলু ভাজি নিয়ে বাসায় হাজির হয়েছিলেন।
আশা করি পাঠক বুঝতে পারছেন ভুল-বুঝাবুঝিকে কিভাবে আমি আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গেছি।।
যাইহোক, এখন আসি মূল ঘটনায়।।
আমার ধারণা, “ভুল বুঝাবুঝির” কারণে উদয়নের শিক্ষকদের হাতে প্রহিত হবার যদি একটি ছোট লিস্ট করা হয়, তবে আমি থাকব এর অগ্রভাগে। উদাহরণ নিম্নরুপঃ
আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি।
রেজওয়ান নামের এক ছেলের সাথে আমার বেশ মাখামাখি।
লাঞ্চের সময় আমরা একসাথে রেজিস্টেন্স খেলি।
সারা উদয়ন আমাদের প্লে-গ্রাউন্ড।
খেলাটা অনেকটা বরফ-পানির মত। ছুঁয়ে দিলেই চোর।
এই যখন পরিস্থিতি, একদিন খেলতে খেলতে আমরা গিয়ে উপস্থিত হলাম রেজওয়ানের ছোট ভাইয়ের ক্লাসে।
গ্যাদা তখন পড়ে ক্লাস ওয়ানে।
ক্লাসে গিয়ে দেখি জনৈক গ্যাদা তাঁর বন্ধুদের সাথে ক্লাসের ভেতর ছুটাছুটি করছে।
এরপর ঘটনা কি ঘটেছিল তা আমার জানা নেই।
আমি তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি।
হঠাৎ লক্ষ্য করলাম রেজওয়ান ক্লাস থেকে ছুটে বেড়িয়ে গেল, আর প্রায় সাথে সাথেই বাকী গ্যাদারা আমাকে ঘিরে ধরে বলছে – ‘এই যে পাইছি, এই ভাইয়া আমাদের চক বোর্ডে উল্টাপাল্টা লেখে দিয়ে যায়।”
গ্যাদাদের কথা শুনে আমি বিস্মিত হলেও ভয় পেলাম না। আইনের শাসন, সত্য -এসবের ওপর তখন আমার অগাধ বিশ্বাস।
শুরুতে আমি তাই তাদের বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে তাঁরা যেই পাপীকে খুজছে আমি সে নই। আমি অতি সহজ-সরল গো-বেচারা এক পাপী।
কিন্তু দীর্ঘ পাচ মিনিট সংলাপের পরও যখন তাদের বোঝানো গেল না,তখন আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিল, এবং আমি ঝেড়ে দিলাম এক দৌড়!
পরিণতি – পাচ মিনিটের মাথায় দেখা গেল ১০-১২ জন অতি উৎসাহী গ্যাদা আমাকে দুই পাশ থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে দো’তলার টিচার্স রুমের দিকে।
গন্তব্য টিচারস রুম।
পাঁচ মিনিট পরের কথা।।
টিফিন টাইম শেষ হবার ঘন্টা পড়েছে।
আমি কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছি নীনা আপার সামনে।
আমার হাত দু’দিক থেকে ধরে রেখেছে ৪-৫ জন গ্যাদা।
একজন গ্যাদা অতি উৎসাহের সাথে আপাকে মিথ্যাচার করে চলেছে – “আপা, এই ভাইয়া ব্ল্যাক বোর্ডে আজেবাজে ছবি আঁকে ক্লাসের পরে। আমরা আজকে হাতে-নাতে ধরেছি”।
গ্যাদার কথা শেষ হবা মাত্রই নীনা আপা আমার দিকে হিংস্রভাবে তাকালেন এবং কোন কিছু জিজ্ঞেস না করেই আমার গাল বরাবর কষে দিলেন এক চড়!
আপার চড় খেয়ে আমি চোখে অন্ধকার দেখলাম।
আপার চড় যে এত কড়া তা তাঁকে দেখে কখনো বোঝা যায়নি। আমি তাই ঘটনার (মিথ্যা মামলার) আকস্মিকতায় যতটুকু না হতভম্ব হলাম, তার থেকেও বেশী বিস্মিত হলাম আপার হাতের জোড় দেখে!
যাইহোক, এই বেগুন অবস্থা থেকে বের হয়ে কিছুটা বোধ শক্তি ফিরে পাবার পর, আমি আপাকে উদ্দেশ্য করে চেচিয়ে বললাম – “আপা! আল্লাহ’র কসম! আমি এই কাজ করিনি! ..”
মনে তখনও আমার ক্ষীণ আশা – সৃষ্টিকর্তার নাম শুনে আপা আমাকে বিশ্বাস করবেন। আপার মন গলবে, এবং আমি ন্যায় বিচার পাবো!
কিন্তু বিধিবাম। ঘটনা ঘটল সম্পূর্ণ এর বিপরীত!
আমার এই কথা শুনে আপা আরো ক্ষেপে গেলেন।
আমাকে তাই তিঁনি আগের থেকেও জোড়ে কোষে দিলেন এক চড়!
দ্বিতীয় চড় আপা কেন দিলেন তা বুঝে উঠতে না পেরে আমি তাই অসহায়ভাবে আবারো চেচিয়ে উঠলাম, “আপা!! আল্লাহ’র কসম! আমি আসলেইইইই এই কাজ করিনি”! .
কিন্তু কে শোনে কার কথা!
আমাকে অবাক করে দিয়ে, তিঁনি আমাকে আগের চেয়েও আরো জোড়ে মারলের আরেক চড়!!!
ঘটনার এ পর্যায়ে আমি তাই নিজেকে ভাগ্যের হাতে সপে দিয়ে চুপ হয়ে গেলাম। সারা রুম ভর্তি টিচার ও ছোট ভাইদের সামনে এমনিতেই তিনি আমার মান-ইজ্জতের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। আমার আর হারাবার কিছু নেই!
যতদূর মনে পড়ে, তিনি এরপর আমাকে আরো একটি রাম চড় মেরেছিলেন, এবং মারতে মারতে বলেছিলেন, “কত বড় সাহস, আল্লাহ’র কসম কাটে!”
বিদ্রঃ আল্লাহ’র কসম খাওয়াতে আপা কেন সেদিন আমাকে তিনটা চড় বেশী মেরেছিলেন আমি তা আজো জানিনা। ইসলামের ইতিহাসে এর আগে বহু সাহাবী আল্লাহ’র কসম খেয়ে বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন। আমি সাহাবী না হওয়াতেই খুব সম্ভবত পরিত্রাণ পাইনি। আমাকে খেতে হয়েছিল মাড়! আমি ছিলাম শুধুই একজন সহজ-সরল, গো-বেচারা প্রাণী।।
Search term: Udayan, Fahim Aziz, allah-er-kosom, nina apa, chor







