আমার গল্পগুলো পড়ে অনেকেই হয়ত ভাবছেন, বাহ! উদয়নে আগে এত মজা ছিল!

নিজেদের অভিজ্ঞতা একটু অন্যরকম হওয়াতে তারা কিছুটা কনফিউস। তাদের জন্য আজকের এই লেখা।

আমি আগেও বলেছি। আমার উদয়নের জীবণকে খুব সহজেই দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

একটা ক্লাস সেভেনে ফেল করার আগে, আর আরেকটা ফেল করার পরে।

যদি ফেল করার আগের জীবণকে ধরা হয়, আমি বলব সেটা আমার জীবণের এক কালো অধ্যায়। আমার লেখার খুব কম স্মৃতি-ই সেই সময়ের। সত্যি বলতে সেই দিনগুলি সম্পর্কে আমার মনেও নেই। কারণটা আমি অনেক চিন্তা করে বের করেছি। আমার ধারণা, মানুষ যখন সার্ভাইভাল মুডে থাকে, তখন সে মাথায় ইতিহাসকে লিপিবন্ধ করে না। ইতিহাস তার মাথায় লিপিবন্ধ হয়, সে যখন সুখের সাগরে ভাসছে, তখন। সত্যি বলতে, ফেল করার আগে, প্রতিটা দিন আমার শেষ হত বাড়ি ফেরার আনন্দে। স্কুলের থেকে তখন আমার পাড়ার ছেলেদের সাথেই মাখামাখি বেশী। পাড়ার শিশু মহলের অঘোষিত নেতা হিসেবেও আমার নাম-ডাক ছিল।

অন্যদিকে, ক্লাস সেভেনে ফেল করার পর যখন আমার পুরো ফ্রেন্ড-সার্কেলটা বদলে গেল! শুধুমাত্র তখনই আমি প্রকৃ্তপক্ষে এই স্কুলকে এত ভালবাসতে শিখেছিলাম।

তখন মনে হতো, ইস! আরো কিছুক্ষণ যদি বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারা যেত!

একজন মানুষের জীবনে যে তাঁর বন্ধুরা কত বড় ভুমিকা রাখে আমিই তার জ্বলন্ত প্রমান। মুরসালিন (ব্যাচ ২০০২), রাফায়েল, হান্নান, নিটল, ফজলে রাব্বী, তারিন, সজল, ফাহিম (২), ফাইয়াজ, মৌসুমি-এরা আমার বন্ধু না হলে‌ সত্যিই আমার বাংলাদেশের স্কুল জীবণটা পানসে হয়ে যেত।

মূলত, আমার আজকের এই অবস্থানের জন্য, আমার সপ্তম থেকে দশম শ্রেণীর ব্যাচমেটদের অনেক ভূমিকা আছে। তবে তাদের মাঝে সবাই কি আবার ভালো বন্ধু ছিল? মটেই না। সবখানেই কিছু ব্যাতিক্রম থাকে। উদাহরণ নিম্নরুপঃ

শুরুতেই বলি। রাজনীতিতে আমি ভালো নই।

যেখানেই রাজনীতি দেখি, আমি চেষ্টা করি নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে।

কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারণে, উদয়নে আমি-ই এই ছাত্র রাজনীতির শিকার হয়ে গেলাম!

আমাকে ঘিরে রাজনীতি হলো – খেলার মাঠে!

ঘটনার ব্যাপকতা বোঝাতে নিজেকে প্রথমে একটু ফুলাই।

আমি যখন ক্লাস ৩-তে পড়ি, পাড়ার বড় ভাইরা (এস এস সি পাশ), আমাকে ক্রিকেট খেলতে নিয়ে যেতেন।

ব্যাটিংয়ে খুবই ভাল ছিলাম, বলিংয়েও খারাপ ছিলাম না।

কানাডা এসেও আমাদের স্কুল টিমে অলরাউন্ডার হিসেবে বেশ ভালোই একটা অবস্থানে আমি ছিলাম।

অথচ, কোন এক বিচিত্র কারণে সেই আমারই উদয়নের কোন দলে কখনো ঠাই হয়নি!

একটু শান্ত প্রকৃ্তির ছিলাম, আবার স্কাঊট করি না – সে কারণেই হয়ত! কে-জানে।

তবে মনে আছে একবার এক পাপীকে গিয়ে বলেছিলাম, “হে পাপী, আমিও দলে খেলতে চাই।”

পাপীর উত্তর, “ভরে দেব! যা ভাগ!” 

স্বাভাবিকভাবেই সেই পাপীর সাথে কথা বলার আগ্রহ আমি আর পাইনি।

বলতে বাধা নেই, উদয়নের কিছু ছেলের মুখের ভাষা শুনলে আসলেই মনে হত না এরা উদয়নে পড়ার যোগ্য।

আমি ভদ্র-শিষ্ট গাধা টাইপ বাচ্চা হওয়াতে এই জাতীয় নেগেটিভ মানুষদের থেকে বরাবরই নিজেকে দূরে রাখতাম (যা বর্তমানেও জারি আছে)।

মূলকথা হল, প্রতি ব্যাচেই কিছু নেগেটিভ মানুষ আছে বা থাকবে। আমাদের উচিত শুধু ভালোটাকে পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। নেগেটিভিটি ভুলে যাওয়া।

যাইহোক, লেখাটি বেশী গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে হাসির দিকে প্রবেশ করা যাক।

যখন লিখতে বসেছিলাম উদয়নের “স্পোষ্ট প্রোগামের হিটস” নিয়ে কিছু কথা লেখব বলে ভাবছিলাম। অনেকেই মেলামাইনের বাটি, হাড়ি-পাতিল পেয়েছেন বলে মন খারাপ। তাদের জন্য নীচের ঘটনাটিঃ

কোন ক্লাসে পড়ি মনে নেই।

খেলার অনুষ্ঠানের আগে হিটস হচ্ছে।

বাধ্যতামূলভাবে আমাদের বলা হল অংক দৌড়ে অংশ নিতে হবে। খেলাটা এমন যে মাটিতে একটা খাতা রেখে তার ওপর কঠিন কঠিন নামতা আর যোগ অংক লেখে রাখা হবে। আমাদের কাজ হল সেটা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি শেষ করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নীনা আপার কাছে খাতা জমা দেয়া।

যাইহোক, বাঁশি পড়ল।

অংক শেষ করেই আমি দিলাম এক ভৌ-দৌড়। এবং প্রায় সাথে সাথেই লক্ষ্য করলাম আমার পাশে প্রাণপনে দৌড়াচ্ছে আরেক পাপী।

ওজন আমার একটু বেশী হওয়াতে সেই পাপীকে চোখের সামনে দেখলাম তীব্র গতিতে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে, এবং ফিনিশিং লাইনে পৌছাবার সাথে সাথে নীনা আপার কাছে থাপ্পর খেতে!

ব্যাপার কি বুঝতে আমি এবং আরেক পাপী থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম দৌড়ের মাঝখানে।

অংক দৌড়ের কথা আমাদের বলা হয়েছিল, কিন্তু দৌড়ের শেষে থাপ্পরও খেতে হবে সেটা বলা হয়নি! এ কেমন খেলায় আমাদের পাঠানো হয়েছে?

এই যখন চিন্তা করছি, আমাদের পাশ কাটিয়ে দেখলাম আরও কিছু পাপী ভয়ে ভয়ে নীনা আপার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আনন্দের সাথেই দেখলাম – তাদেরকে থাপ্পর মারা হলো না।

সাহস করে তাই ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে নীনা আপাকে জমা দিলাম অংক। তিনি দেখে খুশি হয়ে বললেন, “এই যে আরেকটা এখানে। এর অংক মিলেছে”।

পাচ মিনিট পরের কথা – নীনা আপাকে দেখলাম সেই পাপীকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে। তাঁর অংক ঠিক ছিল।

বি দ্রঃ সেই পাপী চড় খেয়েছিল, কারণ অতি স্পিডে দৌড়ে যাবার পর ফিনিশিং লাইনে সে খেই হারিয়ে ফেলে, এবং নীনা আপাকে ধাক্কা দেয়। সেই হিটে সে হয়েছিল প্রথম এবং আমি হয়েছিলাম পঞ্চম।

যারা হাড়ি-পাতিল নিয়ে দুঃখে আছেন, ভাবুন তো? কোনটা ভালো? প্রথম হয়ে হাড়ি পাতিল, নাকি নীনা আপার থাপ্পর?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *