আলি আসগার স্যারের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ক্লাসে সেভেনে।
মধ্যবয়স্ক, ছোট-খাটো, সুদর্শন ভদ্রলোক। আধা-পাঁকা পরিপাটি চুল। চশমা পড়তেন কি-না মনে পড়ছে না।
যাইহোক, আলি আসগার স্যার আমাদের তখন বিজ্ঞাণ পড়াতেন। ক্লাসে এসে প্রথম বিশ মিনিট ঝড়ের বেগে বই থেকে রিডিং করতেন, তারপর পরের বিশ মিনিট কি পড়িয়েছেন তাই নিয়ে যা ইচ্ছে তাই প্রশ্ন করে আমাদের বিপদে ফেলার চেষ্টা করতেন।
তাঁর সাথে আমার প্রথম মুলাকাতের ঘটনা নিম্নরুপঃ
ক্লাস সেভেনের প্রথম বিজ্ঞাণ ক্লাস।
দুপুরের দিকে স্যার ক্লাসে এসে রেজিস্টার খাতায় আমাদের উপস্থিতি নিলেন, এবং বিচিত্র এক প্রশ্ন করে বসলেন। প্রশ্নটি হলঃ ভবিষ্যতে আমরা কি হতে চাই? কোন দুটি পেশা আমাদের সব থেকে বেশী পছন্দের?
নিজের সম্পর্কে কিছু একটা বলতে পারব উপলব্ধি করে আমরা তখন সবাই আহাল্লাদিত। এর আগে কেও আমাদের জিজ্ঞেস করেনি আমরা কি হতে চাই!
যাইহোক, আমাকে যখন স্যার জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি হতে চাই? আমি তাঁকে বিজয়ীর হাসি দিয়ে বললাম, “স্যার – আর্মি অফিসার, আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।“
আমার উত্তর শুনে স্যার কিছুক্ষণ বিস্ফরিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বললেন, “এই বয়সেই কু করার চিন্তা ভাবনা করছিস?”
এরপর হুংকার দিয়ে বললেন, “তুই দাড়া বেঞ্চের ওপর! কানে ধর!”
সেই শুরু।
এরপর আর স্যারের সাথে আমার সম্পর্ক এইটে ওঠার আগে জোড়া লাগেনি।
কারণে-অকারণে তিঁনি আমাকে পেছনের দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতে শুরু করলেন।
“কারণে” – কারণ আমি নিজেও কিছু গাঁধামি করেছি। উদাহরণস্বরুপঃ
স্যার হয়ত মেম্ব্রেইন নিয়ে রিডিং পড়তে পড়তে উদাহরণ দিলেন, মেম্ব্রেইন হল আমিব্যার বাইরের আবরণ। আমাদের গায়ের এই শার্টের মত। আমি হাত তুলে জিজ্ঞেস করে বসলাম, স্যার, আপনার শার্টটা কি মেম্ব্রেইন?
তিঁনি নিজের শার্টের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ভেতরের স্যান্ডু গেঞ্জি দেখা যাচ্ছে।
হুংকার দিয়ে বললেন, “তুই দাড়া বেঞ্চের ওপর! কানে ধর!”
আবার “আকারণে” – কারণ এক পর্যায়ে আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখতে রাখতে তা স্যারের অভ্যাস হয়ে গেল। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে না দেখলে তাঁর অস্থির লাগত। ক্লাসে এসে হয়ত দেখলেন আমি বসে আছি, তিনি অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, “তুই বসে আছিস কেন? যা পেছনে গিয়ে দাঁড়া!”
এই যখন পরিস্থিতি, হঠাৎ একদিন দুপুরে এল কালবৈশাখী ঝড়।
(পাঠক, আমি উপমা হিসেবে বলছি না। আসলেই কালবৈশাখী ঝড়।)
আমাদের ক্লাসটা বিল্ডিংয়ের পেছনের দিকে হওয়াতে নিমিশেই সেখানে নেমে এল রাজ্যের অন্ধকার।
আমরা তখন রিফাত আপার সাথে ইংরেজী ২য় পত্র ক্লাস করছি।
রিফাত আপা ঘুমিয়ে আছেন।
ক্লাস জুড়ে বয়ে চলেছে ঠান্ডা হাওয়া, আর সেই সাথে গ্রীলের পানি ভেজা একটি মিষ্টি গন্ধ।
রোমান্টিক ওয়েদার বলে এর ফাঁকে কেও একজন গিয়ে ক্লাসের লাইট বন্ধ করে দিয়ে এসেছে।
অন্ধকার ঘরে বসে আমরা জানলার বাইরের হালকা বেগুণী আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি।
প্রকৃ্তির স্নিগ্ধতায় আমরা মুগ্ধ – বাকহারা।
এমনই যখন একটা আবেগের ভেতর আছি, পিনপতন নিরবতা ভাঙল সামসুর ঘন্টার বাড়িতে।
রিফাত আপা লাফিয়ে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন চারপাশ অন্ধকার।
কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “লাইট বন্ধ কেন? লাইট জ্বালাও।“
আপার আকুল আবেদনে কেও একজন ছুটে গিয়ে লাইট জ্বালালো, এবং লাইট জ্বালাতেই তিঁনি ছুটে বেড়িয়ে গেলেন।
যাইহোক, রিফাত আপা বেড়িয়ে যেতেই সর্বসম্মতভাবে আমরা ঠিক করলাম আজকে আর ক্লাস করা যাবে না। এমন রোমান্টিক ওয়েদারে আর যাই করা যায়, পড়ালেখা করা যায় না।
আমাদের পরের ক্লাস ছিল বিজ্ঞান।
আমরা তাই ঠিক করলাম আসগার স্যার আসার আগেই এমন ব্যাবস্থা নিতে হবে, যেন ক্লাস বাতিল হয়ে যায়।
ষড়যন্ত্রের প্ল্যান আনুযায়ী আমরা তাই টিউব লাইটের স্টাটার খুলে ফেলে দিলাম ৫ তালার পেছনের জানলা দিয়ে।
পাঁচ মিনিট পরের ঘটনা।
আসগার স্যার বিস্মিত চোঁখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
এক সাথে চারটি টিউব লাইট নষ্টের ব্যাপারটা তিনি মেনে নিতে পারছেন না।
তাঁর নির্দেশে তাই সামসু-কে ডাকা হয়েছে।
সামসু টিউব লাইট ঠিক করতে উপরে উঠেই দিলেন চিৎকার, “স্যার একটার-ও স্টাটার নাই ।“ মুখে বিজয়ের হাসি।
ত্রিশ মিনিট পরের কথা।
আকাশ তখন বেগুনী থেকে কালো রং ধারণ করেছে।
আমরা সবাই চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছি। মাথার ওপর জ্বলছে টিউব লাইট ।
আসগার স্যার আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন কড়া চোঁখে।
হুংকার দিয়ে আবার বললেন, “লাস্ট ওয়ারনিং। কে করেছে বল! নাইলে সবাই শাস্তি পাবি”
স্যারের কথা শুনে আমাদের আত্মা কেঁপে উঠল বটে। কিন্তু একজন উবিয়ান-কে শাসকগোষ্ঠীর হাতে এভাবে তুলে দেয়া যায় না। আমরা তাই সবাই শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত হলাম।
ঠিক হলো, আগামী ক্লাসে ৫০ জন ছাত্র দশ টাকা করে এনে জমা দেব জরিমানা হিসেবে। সেই টাকা কালেকশানের দ্বায়িত্ব দেয়া হল হান্নান-কে।
পরদিন দুপুরের কথা।
টিফিন টাইমে নীচে খেলতে গিয়ে দেখি সবার হাতে কোক আর সিঙ্গারা। ক্লাসে যাদের প্রভাব একটু বেশী, তাদের হাতে দু’টা করে সিঙ্গারা।
জিজ্ঞেস করে জানা গেল হান্নান সবাইকে কোক আর সিঙ্গারা খাওয়াচ্ছে।
ফ্রী যখন পাচ্ছি – আমিও খেলাম, এবং পরদিন আসগার স্যারকে টাকা জমা দেবার দিন জানলাম, হান্নানের টাকা কালেকশানের হিসেব মিলছে না।
২৪০ টাকা মিসিং।
যথারীতি আসগার স্যার এসে বিস্মিত চোঁখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
তাঁর সামনে হান্নান কাঁচুমাঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হান্নানের সাথে স্যারের কথোপকথন নিম্নরুপঃ
“টাকা মিসিং?”
”জ্বী স্যার।“
“কত মিসিং?”
“২৪০ টাকা, স্যার”
“এই বয়সেই দূর্নীতি করতে শিখছিস?”
”জ্বী না স্যার! টাকা ব্যাগে ছিল। লাঞ্চ থেকে আইসা দেখি নাই!“
“নীচু হ!”
”জ্বী স্যার?“
“নীচু হ! মাথা বেঞ্চের নীচে ঢুকা।“
দুই মিনিট পরের কথা।
আসগার স্যার হান্নানকে মেরুদণ্ড বরাবর গদাম দিলেন।
ক্লাসে মৃদু হাসির গমগম শোনা গেল।
Search term: aaj_r_class_noy, fahim aziz, ali asgar sir, ali, udayan







