হ্যালুয়িন (halloween)

টরোন্টোর সাবওয়েতে বাঙ্গালিরা সাধারণত চোখ বুঁজে চলাফেরা করে।

পাঠক যদি মনে করে থাকেন, আমি এটা কথার কথা বলছি – তাহলে ভুল করবেন।

আসলেই তাদের চোখ বন্ধ থাকে!

দূর থেকে দেখলে মনে হবে – তারা গভীর ঘুমে মগ্ন। এই নাক ডাকলো ডাকলো করছে!

কিন্তু আসলে পুরোটাই অভিনয়।

নিজে বাঙালি হওয়াতে, তাদের অভিনয়ের এই কারণ আমি বুঝি এবং মাঝে মধ্যে নিজেও মঞ্চস্থ করি।

তাদের, মানে আমাদের, এই চোখ বন্ধের কারণ দুইটি।

প্রথমটি হল, কাজে পৌছাবার আগে নিজেকে একটু রিচার্জ করে নেয়া।

আর দ্বিতীয়টি হল, বয়স্ক কেও হঠাৎ সামনে চলে এলে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার ঝামেলাটা এড়ানো।

বেশ কিছুদিন আগের কথা।

সকাল আটটায় ট্রেনে করে কাজে যাচ্ছি।

রাশ আওয়ার হওয়াতে ট্রেন লোকে লোকারণ্য।

আমি কানে হেডফোন দিয়ে “ভূত এফ এম” শুনছি। চোখ বন্ধ।

আশেপাশে কোন পোয়াতি এসে পেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেও এই চোখ গন্তব্যে পৌছাবার আগে আর খুলছে না!

যারা “ভূত এফ এম” কি জানেন না, তাদের জন্য বলছি – এটা একটা বাংলাদেশি রেডিও শো। সেখানে মানুষজন এসে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া ভূতুরে কাহিনীগুলো শেয়ার করত। “করত” বললাম কারণ এখন সেই প্রোগ্রাম আর হয়না। তবে অনলাইনে এর আগের অডিও রেকর্ডগুলো পাওয়া যায়।

কঠিন চিত্তের মানুষরা শুনে দেখতে পারেন।

আমার মত দূর্বল চিত্তের মানুষদের এই জিনিষ এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়। বিশেষ করে যাদের গাড়ি বাড়ির পেছনে অন্ধকারে পার্ক করা থাকে।

যাইহোক, “ভূত এফ এম” শুনতে শুনতে কখন একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে গেছি নিজেও টের পাইনি।

গল্পটা বেশ ভৌতিক। গা শিউরে ওঠার মত।

এক ব্যাক্তি তার এক আত্মীয়ের লাশ নিয়ে নৌকা পার হচ্ছেন। রাত বাজে একটা। হাসপাতাল থেকে লাশ ছাড়াতে দেরি হয়ে যাওয়ায় এই বিপত্তি। বেশি দেরি হওয়াতে জানাজা, গোসল না করিয়েই তিনি রওনা দিয়েছিলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। কিন্তু ঘাটে এসে দেখেন একটি মাত্র নৌকা খালি। বাকি সব বন্ধ। বাড়তি ভাড়া বায়না করে তাই তিনি সেটাই নিয়েছেন। কিন্তু মাঝ নদীতে হঠাৎ তিনি শুনলেন হাড় কামড়ানোর মড় মড় শব্দ। পেছনে ফিরে দেখেন মাঝি লাশের পাশে বসে তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। মুখ ভর্তি রক্ত। ঘটনার আগা-মাথা শুরুতে না বুঝলেও পরে যখন ব্যাপারটা টের পেলেন – তিনি জ্ঞাণ হারালেন। পরদিন সকালে যখন জ্ঞাণ ফিরলো – তিনি দেখেন তাকে ঘিরে বিশাল এক জটলা। তিনি আর আত্মীয়ের লাশ খালি নৌকায় পড়ে আছে। লাশটার একটা পা কেও খেয়ে ফেলেছে।

এমন একটা ভয়ংকর ঘটনা শোনার পর আমি চোখ খুলে তাকাতে বাধ্য হলাম।

এই মূহুর্তে আমার দরকার মানুষের সান্নিধ্য। মন থেকে ভয়টা দূর করা প্রয়োজন।

সাহিত্যের ভাষায় আমার তখন শিরদাড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইছে। বুক ধুকপুক করছে, এবং শরীরের সব লোম দাঁড়িয়ে গেছে।

“কিন্তু চোখ খুলে যা দেখলাম তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না”। – “ভূত এফ এম” এর কমন ডায়লগ।।

আমার সামনে দাঁড়িয়ে কালো জোব্বা পড়ে হাসছে তিনটা সাদা ভূত!

ঘটনার এই আকস্মিকতায় আমি খানিকটা বিচলিত হলাম।

আমি এমন কোন পীর-দরবেশ না যে ভূতরা আমার কাছে এসে দোয়া চাইবে।

তালগোল হারিয়ে যখন অজ্ঞাণ হবার চেষ্টা করছি, তখনই মনে পড়ল – আজ হ্যালোয়িন।

পশ্চিমা দেশগুলোতে এই বিশেষ দিনে নারী পুরুষ সকলে ভিন্ন সাজে সেজে কাজে যায়।

রাতে আবার তারা বাচ্চাদের চকলেট বিলি করে ফুর্তিও করে।

বাচ্চা-কাচ্চা হবার পর এই দিন আমাদের জীবণেও এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।

রাতের বেলা আমরা এখন বাচ্চাদের নিয়ে বের হই চকলেট সংগ্রহে।

তাদের সাজানো হয় বিভিন্ন সাজে – কখনও বাঘ, কখনও ভাল্লুক। কখনও আবার কোন মুভির মেইন ক্যারেক্টারের আদতে।

গত হ্যালুয়িনে বাচ্চাদের সাথে আমাকেও গিন্নি সাজিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।

আমি মুভি তেমন একটা দেখিনা। ফেন্টাসি ওয়ার্ল্ড হলে তো আরও না!

সেই আমাকেই কি-না সাদা দাড়ি পড়িয়ে বানানো হলো গান্ডার্ফ।

রাস্তায় হাটার সময় দেখা গেল সেই ক্যারেক্টারকে আমি ছাড়া আর বাকি সবাই চেনে!

আমি ছেলেদের হাত ধরে হেটে যাচ্ছি।

লোকে আমাকে দেখে হাসছে, টিপ্পানি কাটছে। মাঝে মাঝে কেও কেও এসে এপ্রিশিয়েটও করছে। আর আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি! কি সেজেছি জিজ্ঞেস করলে বলতে পারছি না!

আমার এই বিব্রতকর পরিস্থিতি দেখে দুই ছেলের বা গিন্নির তেমন কোন দয়া-মায়া হলো বলে মনে হলো না। প্রায় ঘন্টার পর ঘন্টা আমাকে এই অবস্থায় এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় ঘোরানো হলো।

তবে তারপরও ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ মজার লেগেছে।

অনেক বছর আগে এই ভাবেই আমার ছোট ভাইকে হাতে ধরে পাড়াময় ঘুরাতাম আর চকলেট সংগ্রহ করতাম।

পদ্ধতিটাও বেশ ভিন্ন।

যে সব ঘরের বারান্দায় আলো জ্বলানো আছে, শুধু তাদের কাছেই চকলেট চাওয়া যাবে। লাইন বন্ধ মানে হয় তাদের চকলেট ফুরিয়ে গেছে, অথবা এই সব ফাতরামির অংশ হতে তারা নারাজ।

হ্যালুয়িনে আমার কাজ হলো ছেলেদের নিয়ে আলো জ্বলা বারান্দা খুজে বের করা, এবং সিড়ি ভেঙ্গে তাদের বারান্দার দরজা পর্যন্ত পৌছে দেয়া।

এরপর তাদের দরজায় কড়া নেড়ে বলতে হবে – “ট্রিক অর ট্রিট”।

আশা করা যায় কেও তখন ঘর থেকে বের হয়ে এসে তাদের হাতে কিছু চকলেট গুজে দেবেন।।

তবে এ বছর মনে হয় না আমাদের এক সাথে “ট্রিক অর ট্রিট”-এ যাওয়া হচ্ছে।

সেদিন আমার খুব কাছের এক মানুষের বিয়ে।

এত দিন থাকতে হ্যালুয়িনে কেন বিয়ের দিন ফেলা হলো সেটা একটা রহস্য বটে।

ভয়ংকর দিনে, ভয়ংকর কাজ! – ব্যাপারটা কি সেরকম কিছু?

যাইহোক, চিন্তার ঘোড়া এই মূহুর্তে লাগাম ছাড়া ছুটে চলেছে । লাগাম টানা দরকার।

লেখা শেষ করি ছোট একটা ঘটনা দিয়ে।

এ বছর হ্যালুয়িনের গোছগাছ আমার গিন্নি বেশ আগে থেকেই শুরু করেছিলেন।

বিয়ের প্রোগ্রাম পড়ে যাওয়ায় তাতে কিছুটা ভাটা পড়লেও একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি।

শেষমেশ ঠিক হয়েছে এবার আমাকে ছাড়াই ছেলেদের নিয়ে গিন্নি আর শাশুড়ি হ্যালুয়িনে যাবেন।

আমার বড় ছেলে হ্যালুয়িন বোঝে।

ইতিমধ্যে সে নতুন বাকেট কিনেছে। সেই বাকেটের হাতলে চাপ দিলে আবার লাইটও জ্বলে।

এই মূহুর্তে তাকে “যেতে হবে না” – বলে খলনায়ক হবার কোন ইচ্ছে আমার নেই। তাই আমি সব মেনে নিয়েছি।

তবে এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই কি-না, সেদিন গিন্নি আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন এক পামকিন ফার্মে। নাম – Sweet Ridge Farms

প্রথমে ছোট মনে হলেও, পরে দেখি এলাহি কান্ড!

মুরগীর ফার্ম, ভুট্টার মেইজ, ট্রাকটার রাইড – কি নেই সেখানে!

মুরগীর ফার্মে আবার মুরগীকে খাওয়ানোর জন্য আলাদা করে ভুট্টাও বিক্রি করা হচ্ছে।

ছেলেগুলোর নতুন অভিজ্ঞতা হবে বলে তাই ভুট্টাও কেনা হলো।

দুই মিনিট পরের কথা, ছেলেরা মুরগীকে ভুট্টা খাওয়াচ্ছে আর গিন্নি ভিডিও করছে।

ভিডিও শেষে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করার পরে জানা গেল ছোট ছেলের পায়ের জুতা মিসিং।

পরে সেটা খুজে পাওয়া গেছে ৫ ফুট দূরে।।

Few Details About Sweet Ridge Farms

Parking: Plenty. However can get tight if gets too crowded. Parking is free on the site.
Entry fee: $8 per adult, $6 per kids (age 5 – 12)
Chicken Food: $4
Address: 8327 Steeles Ave E, Scarborough, ON M1X 1P2
Direction: https://maps.app.goo.gl/GMoRsEYrP7igr15a9

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *