কোচিং কাহিনী

২০০০ সালের মাঝামাঝি।

ক্লাসের শেষে কোচিং করানোর একটা চল তখন উদয়নে শুরু হয়ে গেছে।

মাসিক ৩০০ টাকা হারে ফাটিয়ে চলছে কোচিং ব্যাবসা।

অংক, বাংলা, ইংরেজী-র মত মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পাশেও – সমাজ, কৃষি-বিজ্ঞাণ, ও ধর্মের কোচিংও চলছে সমান তালে।

বেশির ভাগ ছাত্রই এসব কোচিংয়ে যেত দুটি মহৎ উদ্দেশ্যে। প্রথম উদ্দেশ্য, শিক্ষকদের সুদৃষ্টি পাওয়া, দ্বিতীয় উদ্দেশ্য, ফাইনাল পরীক্ষার আগের বিশেষ সাজেশান!

খারাপ ছাত্র হওয়াতে আমি প্রায় সব সাবজেক্টেই কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছি।

এদিকে ছেলের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আমার মা-বাবা ও দাঁতে দাঁত চেঁপে সব সহ্য করছেন।

পানির মত টাকা খরচ হচ্ছে।

এমনই যখন পরিস্থতি, ক্লাস এইটে থাকতে আমি এক মেয়ের কঠিন প্রেমে পড়ে গেলাম।

যেহেতু আশা করি এত দিনে তাঁর একটা সুন্দর সংসার হয়ে গেছে, তাই এখানে তাঁর নাম উল্লেখ করছি না। ঘটনার পরিপ্রক্ষিতে সেটা গুরুত্বপূর্ণও নয়।

যাইহোক, মেয়েটিকে আমি প্রথম দেখি নাজমা আপার সমাজ কোচিংয়ে।

কাপুরুষ হওয়াতে নিজে থেকে তাঁর সাথে আমি কখনো কথা বলিনি।

তবে জহোরা আপা’র কোচিংয়ে এই বিষয়টি জানার পর এক অতি উৎসাহী শুভাকাঙ্খি (!) কথাটি তাঁর কানে ঠিকই পৌছে দিয়েছিল।

যত দূর শুনেছি, শুভাকাঙ্খির মুখ থেকে আমার কথা শো্নার পর মেয়ে বিস্ফোরিত চোখে বলেছিল, “আমাদের বংশে কেও কোনদিন প্রেম করে নাই।”

তবে সমস্যা দেখা দিলো, আমি তখন সব আশাবাদী প্রেমিকদের সাথে ঘুরাঘুরি করি। মেয়েটির ভয়ার্ত্য আর্তনাদকেও তারা আমার কানে পৌছে দিল ভালোবাসার বার্তা হিসেবে।

প্রিয় বন্ধু হান্নান আমাকে আশা দিয়ে বলল, “ দোস্ত, মন খারাপ করিস না। মেয়েরা ভালবাসলে প্রথমে “না” “না” বলে। হিন্দী মুভিতে দেখিস না? এমন হয়! মেয়ে বলেছে বংশে কেও প্রেম করনি। সে করবেনা সেটা তো বলেনি! তুই লেগে থাক!”

কোন এক বিচিত্র কারণে হান্নানের কথাগুলো সেদিন খুব মনে ধরেছিল।

আমি তাই মেয়েটির পেছনে লেগে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।

তবে এই লেগে থাকা বলতে আমি কি বোঝাচ্ছি তা নীচের উদাহরণটি পড়লেই পাঠকের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

দুপুরে স্কুল শেষ হবার পর আমি আর হান্নান তেঁতুল গাছের নীচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।

হঠাৎ দেখি সেই মেয়েও তাঁর গার্জিয়ানের সাথে বাড়ি ফিরছে।

কোন কিছু চিন্তা না করেই আমরাও দৌড় তাঁর পেছনে পেছনে। উদ্দেশ্য – তাঁর গাড়ির নাম্বার টুকে রাখা।

দুই মিনিট পরের কথা।

আমি আর হান্নান বিজয়ী হাসি দিয়ে ব্যাগে খাতা ঢুকাচ্ছি – গাড়ির নাম্বার টুকে ফেলেছি।

ঠিক এমন সময় পাশ থেকে হান্নানের প্রশ্ন – তা, এখন এই নাম্বার দিয়ে করবো-টা কি?

যাইহোক, গাড়ির পেছনে আমাদের এই পাগলা দৌড় বা অন্য যেকোন কারণেই হোক – মেয়েটি আমাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল, এবং সমাজ কোচিং থেকেও নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিল!

এদিকে তাঁকে সমাজ কোচিংয়ে না দেখে আমার প্রাণ যায় যায়।

প্রিয় বন্ধু হান্নান তখন আমাকে দিল আরও এক মারফতি বুদ্ধি – “শোন, আমি এই মেয়ে কে ডালু আপার বাড়ী কোচিংয়ে দেখেছি। তুই আপাকে গিয়ে বল তুই আমাদের ব্যাচে পড়তে চাস। আমরা ওই মেয়ের আশেপাশে বসব। নো চিন্তা।”

বাসায় এসে আমার মা-কে এই আবদারের কথা বলায়, প্রথমবারের মত তিনি বলে বসলেন – তোমাকে জোহরা আপার বাসায় কোচিংয়ে দিলাম, স্কুলে সব সাবজেক্টে কোচিংয়ে দিলাম, এখন আবার ডালু আপা?

বুঝলাম বাজেটের ব্যাপারে আমার মা একটু সংকিত। সে সময় বাড়ি গিয়ে পড়তে মাসে ১০০০ টাকা লাগে। জোহরা আপা আর ডালু আমার কাছে পড়তে গেলে মাসে ২০০০ সেখানেই যাচ্ছে। তার ওপর ৩০০ করে বাকী সাবজেক্টে!

আমি তাই প্রেমের খাতিরে ঠিক করলাম স্কুলের কোচিংয়ে কাট-ছাট করে বাজেট ব্যালেন্স করতে হবে।

প্রথমেই নাজমা আপার কাছে গিয়ে কাচুমাচু হয়ে বললাম, আপা, আম্মার টাকা নাই, তাই কোচিং ছাড়তে হবে।

নাজমা আপা আমাকে ক্লাসের বাইরে নিয়ে গিয়ে বললেন – “তোমার টাকা দিতে হবে না। তুমি ফ্রী-তে পড়বা। কোচিং ছাড়বা না।“

মাঝে মধ্যে তাই মনে হয় কত অসাধারণ কিছু মানুষ আমাদের শিক্ষক ছিলেন। জীবণ চালাতে টাকা অবশ্যই জরুরী, কিন্তু সেটা তাদের কাছে কখনোই মূখ্য ছিল না। আমাদের তারা ভালবাসতেন নিস্বার্থভাবে। চাইতেন আমরা আসলেই কিছু শিখি তাদের কাছ থেকে। এখন ব্যাপারটা উপলব্ধি করি যে, হ্যা হয়ত আমরা কোচিংগুলোতে মূলত যেতাম সাজেশানের লো্ভে, তবে সত্য হল – আপারা যা জানি তার থেকেই সাজেশান দিতেন। অর্থাৎ, বুঝে হোক বা না বুঝে, আমাদের দিয়ে তারা কাজ ঠিকই করিয়ে নিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরুপ বলি। নীলমনি স্যারের কাছে ইংরেজী কোচিংয়ে সাজেশান চাওয়ায় তিনি ক্ষেপে গিয়েছিলেন। পরে ১৮ টা রচনার মধ্য থেকে ১৬ টা পড়তে বলেছিলেন ফাইনাল এক্সামের জন্য। এক্সামে তাই গিয়ে দেখি সব গুলো রচনাই কমন পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *