ক্লাস এইটে রাকিবা আপা ছিলেন আমাদের বাংলার শিক্ষক।

ছিপছিপে গঠনের, সুদর্শন ভদ্রমহিলা।

প্রতিটি শিক্ষকেরই তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের শায়েস্তা করার জন্য বিশেষ কিছু পদ্ধতি থাকে।

রাকিবা আপার বিশেষ ক্ষমতা ছিল – চিৎকার করে পিলে চমকে দেয়া।

কোন ছাত্র ভুল করলেই তিনি কাঁপা কাঁপা আংগুল তুলে তাঁর দিকে নিশানা করতেন, এবং ক্লাসের সবাই যখন তাঁর দিকে তাকাতো, তখন চিৎকার করে “খুনি… খুনি” বলে তাঁকে অপদস্ত করতেন। খুনি কেন অপরাধ করে মাফ পাবার যোগ্য নয় সেটা নিয়েও তিনি এক বিশদ লেকচার তাঁকে দিতেন।

তবে এখানে বলে রাখা ভালো, আপার গলা ছিল অত্যন্ত চিকোন। তাঁর চিৎকারটা তাই কানের জন্য ছিল বিশেষ পিড়াদায়ক।

আমার ধারণা, হাই ফ্রিকোন্সিতে চেঁচানোর কোন খেলা যদি পৃথিবীতে থাকত, আপা নির্ঘাত বাংলাদেশের জন্য অলিম্পিকের সোনা ছিনিয়ে আনতেন।

পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে আপার চিৎকারের একটি নমুনা নিম্নরুপঃ

ঘটনার দিন ক্লাসের এক ছেলে হোমওয়ার্কের খাতা আনতে ভুলে গেছে।

তাঁর রোল কল করা হলে, অন্য আর সবার মত সেও “লা হাউলা ওয়ালাকু’আতা ইল্লা বিল্লাহ” পড়তে পড়তে আপার কাছে গিয়ে উপস্থিত হলো। আপার সাথে তাঁর কথোপকথন নিম্নরুপঃ

আপাঃ কৈ, খাতা কুতায়?

ছাত্রঃ আপা, খাতা আনতে ভুলে গেছি।

(আপা চিৎকার দিয়ে) – কেন? খাতা আনতে কেন ভুলেছো? তুমি তো আসতে ভুলোনি! খাতা কেন বাড়ি রয়ে গেল?

ছাত্রঃ আপা, স্যরি।

আপাঃ “স্যরি?! একজন খুনি যদি কাওকে খুন করে বলে আমি ‘স্যরি’। তাঁকে কি মাপ করে দেয়া যাবে?!

ব্যাস!

এরপর তিনি ছেলের দিকে তাঁকিয়ে কাঁপা কাঁপা আংগুল তুলে নিশানা করলেন, এবং ক্লাসের সবাই যখন তাঁর দিকে তাকালো, তখন চিৎকার করে উঠেলেন, “খুনি…তুমি খুনি!”

এখানে উল্লেখ্য, রাকিবা আপাকে আমি কখনো কারো গায়ে হাত তুলতে দেখেছি কি-না মনে করতে পারছি না। ্কারো সেই অভিজ্ঞতা থাকলে শেয়ার করতে ভুলবেন না!

যাইহোক, এই যখন পরিস্থিতি, প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় হলে গিয়ে দেখি আমার বাংলা রচনা কমন পড়েনি।

নিজ গুণে এবং বলে আমি তাই মনের মাধুরি মিশিয়ে লিখে ফেললাম বিশাল এক রচনা।

সেই রচনার বিষয়বস্তু কি ছিল আমার আজ মনে নেই, শুধু মনে আছে আমাকে চমকে দিয়ে খুব ভালো একটা মার্কসই তিনি আমাকে দিয়েছিলেন!

কিন্তু এরপর থেকে সমস্যা হলো রাকিবা আপা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতে শুরু করলেন। ক্লাসে তিনি সবার আগে আমাকে পড়া ধরেন, আমার হোমওয়ার্কের খাতা জমা নেন, এবং সব থেকে ভয়ংকর বিষয় – অন্যদের আমার মত হতে বলেন! ঘটনা নিম্নরুপঃ

ক্লাসে সেদিন আমি কাটাকুটি খেলছি। হঠাৎ শুনি ‘খুনি খুনি” চিৎকার। আপার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি আমার দিয়ে আংগুল ইশারা করে আছেন। বুক ধক্ক করে উঠতে দেখি পাশের বেঞ্চের একজন দাঁড়িয়ে আছে, আর আপা আমার দিকে আংগুল তুলে বলছেন- ফাহিমকে দেখো! কি সুন্দর পড়ালেখা করছে। ওকে ফলো করো!”

যাকে গালাগালি দেয়া হচ্ছে, সে আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে দেখে আমি কাটাকুটি খেলছি। দেখে সেও অবাক, আমিও অবাক!

ঘটনা অবশ্য এখানে শেষ হলেও পারত।

কিন্তু খোদার লিলা খেলা!

পরের বছর আপাকে শিক্ষক হিসেবে না পেলেও, তাঁর ব্যাপারে একটি মুখোরোচক কাহিনী চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।

কাহিনীর মূল বিষয়বস্তু, আপা নাকি ক্লাসের সব থেকে সুন্দর ছেলেদেরকে বেঁছে বেঁছে তাদের সাথে খাতির জমান, এবং তাদের বকাবকি কম করেন। (ডার্টি মাইন্ডের পাঠকদের আশাহত করছি, এটা অশ্লীল কিছু ছিল না)।

যাইহোক, নীচের ঘটনাটি লোকমুখে শোনা। যেভাবে শুনেছি সেভাবেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছি।

নবম শ্রেণী।

ক্লাসে ঢুকেই রাকিবা আপা চারপাশে চোখ বুলালেন।

যে কয়জন সুন্দর বালক-বালিকা তাঁর চোখে পড়ল, তাঁর মাঝে একজন কার্ডিগেনের বোতাম ঠিক মত লাগাতে পারে না (পাপীষ্টা – এই ঘটনার রাজ সাক্ষী), আর অন্যজন একটু বেশী হ্যাংলা পাতলা (পাপী)।

প্রথমে তিনি ঠিক করলেন কার্ডিগেনের বোতাম উপরে-নীচে করে লাগানো পাপিষ্টাকে এক গাল দিয়ে নিবেন। এতে করে ক্লাসে তাঁর অথোরিটি প্রকাশ পাবে। এরপর কথা বলবেন পাপীটার সাথে।

পাঠক, কারডিগেনের ব্যাপারটা সেই পাপিষ্টা নিজ মুখে এই পেইজে প্রকাশ করেছে। আমি তাই শুধু পাপিটার সাথে ম্যাডামের ধারণা-প্রসূত কথাবার্তা তুলে ধরছি।

উল্লেখ্য, এই সুন্দর পাপীর গলাও ছিল হুবুহু ম্যাডামের মতঃ

ম্যাডামঃ এই ছেলে! তোমার নাম কি? তুমি দাড়াও।

ছেলেঃ ম্যাডাম, পাপী। (ছদ্দ নাম)

ম্যাডামঃ তুমি কি আমার সাথে মশকরা করছো?

ছেলেঃ না মানে, কেন ম্যাডাম?

ম্যাডামঃ কেন তুমি বোঝনা? তুমিও কি ওই পাপিষ্টার মত খুনি হতে চাও? আমাকে তুমি ভ্যাংগালে কেন?

ছেলেঃ ম্যাডাম আমি তো ভ্যাংগাইনি!

ম্যাডামঃ এই যে আবার ভ্যাংগালে! বেয়াদপ ছেলে!!

*টুট টুট টুট*

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *