রিউমেটিক ফিবার 

আমি জানি না রিউম্যাটিক ফিভার কেন হয়, বা এটি ছোঁয়াচে কি-না। ডাক্তাররা এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি এই রোগে পতিত হই ১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে।

শুরুটা ছিল খুব স্বাভাবিক।

বিকেল বেলা ক্রিকেট খেলা শেষ করে সন্ধ্যায় পড়তে বসেছি।

হঠাৎ অনুভব করলাম পা’য়ের মাংসপেশীতে ম্যাজ-ম্যাজ করছে।

আমার মা পাশে বসে ছিলেন।

মা-র দিকে আহাল্লাদিত ভাবে বললাম – আম্মা, পা ম্যাজ-ম্যাজ করে।

গ্যাদার মুখে “ম্যাজ-ম্যাজ” শব্দ শুনে তিনি বেশ বিরক্ত হলেন। কিছুদিন আগে গ্রাম থেকে এক আত্মীয় এসে বাড়িতে ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে ছেলে এই সব শব্দ শিখে বসে আছে। “ম্যাজ-ম্যাজ”, “প্যাক”, “ছ্যাপ”।

উত্তরে তিনি তাই ছোট করে ধমক দিয়ে বললেন – হ্যাঁ, পড়তে বসলেই তো্মার খালি হাত-পা ম্যাজ ম্যাজ করে। এক থাপ্পর দিয়ে “ম্যাজ-ম্যাজ” বের করে দেব।

এভাবে গেল আরো বেশ কিছুদিন।

প্রতিদিন-ই আমার পা “ম্যাজ-ম্যাজ’ করে সন্ধ্যার পর।

তবে লক্ষ্য করলাম, এই অনুভুতিটা দিন দিন প্রখর হচ্ছে।

একদিন দুপুরের কথা।

স্কুল থেকে বাসায় এসে হঠাৎ-ই কেন যেন শরীরটা খারাপ লাগা শুরু করল।

সে সময় আমি ইয়ং। দুপুরের ঘুম আমার দু-চোখের বিষ। অথচ সেই আমি-ই কি মনে করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

এরপর দিলাম গভীর এক ঘুম।

ঘুম যখন ভাঙল, বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা।

নিজের ওপর প্রচন্ড রাগ হলো।

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সারাটা বিকেল নষ্ট করেছি।

আজকে আর বাইরে খেলতে যাওয়া হলো না!

কান পেতে বুঝলাম বাসায় সবাই তখন চা-নাস্তা খাচ্ছে।

দূর থেকে মা-খালাদের কোলাহল ভেসে আসছে।

খাট থেকে এক লাফে নেমে খাবার ঘরে যাবার জন্য তাই উদ্দ্যত হয়েই লক্ষ্য করলাম, আমি পা নাড়াতে পারছি না। পাঁয়ের হাঁটুতে প্রচন্ড ব্যাথা।

ব্যাথা এতটাই প্রবল যে কিছুক্ষণ খাটের পাশ ধরে দাঁড়িয়ে থেকে আমি মাটিতে বসে পড়লাম।

এরপর কতক্ষণ কেটে গেছে আমার জানা নেই।

বেশ কয়েকবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করার পরও যখন পারলাম না, কোন এক অজানা আতংক আমাকে পেয়ে বসল।

আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে আমার মা আর নানুকে ডাকতে লাগলাম।

আমার চিৎকারে প্রথম ছুটে এলেন আমার মা।

এসে দেখেন আমি মাটিতে বসে বসে কাঁদছি।

তাঁকে দেখে আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম – আম্মা, আমি হাঁটতে পারতেছি না।

আমার কথা শুনে আম্মাকে দিশেহারা মনে হল।

আমাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়া করাতে করাতে তিনিও ততক্ষণে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেছেন। বারবার তিনি বলছেন, “কি বলো হাটতে পারো না? দাড়াও বাবা। শক্ত হয়ে দাঁড়াও। আমি ধরেছি তুমি দাড়াবার চেষ্টা করো”।

কিন্তু আমার হাটু বারবার ভেঙ্গে আসে। আমি দাড়াতে পারি না। উল্টো কাদতে কাদতে বলি – “ব্যাথা লাগে, পারব না!”

যখন দেখলেন আমি আসলেই আর দাড়াতে পারছি না, তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলেন নানু-কে ডেকে আনতে।

মাটিতে বসে আমি দূর থেকে শুনলাম আম্মা আমার নানুকে কাদতে কাদতে চিৎকার করে বলছেন – আম্মা! আম্মা! আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। ফাহিমের পোলিও হয়েছে, ও হাটতে পারছে না!

এটা বলার সাথে সাথেই শোনা গেল তিন চারটি চেয়ার এদিক সেদিক পড়ে যাবার শব্দ।

সবাই ছুটে এলেন আমার ঘরে।

এদিকে আমিও মাটি থেকে প্রানপণে উঠে দাড়াবার চেষ্টা করছি।

ঘটনার এ পর্যায়ে আমি যতটা না নিজের জন্য উঠে দাড়াবার চেষ্টা করছি, তার থেকেও বেশী চেষ্টা করছি আমার মা-য়ের জন্য।

আমি দাড়ালে মা আর কাঁদবে না।

এটাই তখন আমার কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ।।

এই ছিল আমার রিউম্যাটিক ফিভারের শুরু।

যাইহোক, রিউমেটিক ফিভারের কারণে আমি স্কুলে যেতে পারিনি প্রায় ৪-৫ মাস।

আমার মা আমাকে শুয়ে শুয়ে পাঠ্য বইগুলো পড়ে শোনাতেন। বসে পড়ার সামর্থ্য-ও আমার তখন ছিল না।

অথচ সেই আমিই কিভাবে যেন ফাইনালে ৮৬৫ মার্ক পেয়ে সে বছর পাশ করে ফেলি। সবিতা আপা তাই একবার আমাকে তাঁর কোচিংয়ে বলেছিলেন, তুমি অর্ধেক বছর ক্লাস করে যে রেজাল্ট করেছো, সারা বছর মন দিয়ে পড়লে অনেক ভাল রেজাল্ট করতে পারবে।

দুঃখের বিষয় আপার সে আশা পুরণ হয়নি।

পড়ালেখার পেছনে মন লাগাতে আমি ছিলাম ভিষন ভাবে ব্যার্থ! (অন্তত বাংলাদেশে)।

বিদেশ বিভুয়ে এসে তাই মাঝে মাঝে চিন্তা করতাম, কেন এককালে আমি মন দিয়ে পড়িনি?! তখন পড়াশোনা কত সহজ ছিল! নিজের মাতৃভাষায়!

সে প্রশ্নের উত্তর হয়ত আর কোনদিন জানা হবে না।।

যাইহোক, আজকে আসলে কোন কিছু ভেবে লেখা শুরু করিনি।

facebook-এ কিছু পোষ্ট পড়ে মন কিছুটা বিক্ষিপ্ত হওয়াতে এই লেখা।

শেষ করি একটি মজার গল্প দিয়ে।

ক্লাস থ্রী-তে পড়তে আমার পাশে যেই ছেলে বসত তাঁর নাম ছিল তৌসিফ। ছেলেটি ছিল গোলগাল, এবং তাঁর ঠোট ছিল রক্তবর্ণ।

হঠাৎ একদিন সেই ছেলে স্কুলে আসা বন্ধ করে দিলো।

ফোন দিয়ে জানলাম সে খুব অসুস্থ। বিছানায় পড়ে গেছে।

আমার ছোটখালা তখন সবে মাত্র মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন। কোন রোগী বা রোগের কথা শুনলেই তাঁর একটা কমেন্ট করা চাই-ই চাই। সেটা জেনে হোক বা না জেনে। তৌসিফের বেগুন অবস্থার কথা শুনে তিনি রায় দিলেন – এই ছেলের হাঁটার দিন শেষ। সে প্যারালাইজ হয়ে গেছে।

ঘটনা শুনে আমার পরিবারের লোকজন তাই ঠিক করলেন তৌসিফ-কে দেখতে যাবেন। শত হোক, ফাহিমের বেস্টফ্রেন্ড প্যারালাইজ হয়ে গেছে!

ঘটনা সংক্ষেপে শেষ করি।।

তৌসিফের বাড়ি গিয়ে আমি দেখি ছেলে প্যারালাইজ হয়নি। দিব্যি খেলাধূলা করছে খাটে বসে। খেলার মাঝে সে বড় বড় চোখ করে আমাকে বলল – জানিস, ডাক্তার আমাকে স্কুলে যেতে মানা করেছে। আমার পায়ে অনেক ব্যাথা। হাটতে ব্যাথা লাগে। আমার রিউম্যাটিক ফিভার হয়েছে।

আমি আমার সদ্যলব্ধ জ্ঞাণ নিয়ে তাই স্কুলে গিয়ে সবাইকে ঘটনা খুলে বললাম ।

এক কান দুই কান করে ঘটনা গিয়ে পৌছল টিচারের কানে।

টিচারের সাথে আমার কথপকথন নিম্নরুপঃ

তুমি নাকি তৌসিফকে বাড়ি গিয়ে দেখে এসেছ?

জ্বী আপা।

ওর কি হয়েছে?

আপা ও প্যারালাইস হয়ে গেছে।

(আপা কিছুটা হকচকিয়ে) প্যারালাইস হয়ে গেছে?!

জ্বী আপা। হাটতে পারে না।

বিদ্রঃ এক মাস পরে তৌসিফকে তাই হেঁটে হেঁটে ক্লাসে আসতে দেখে আপা বেশ অবাক হয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *